সর্বশেষ আপডেট

— শারমিন আক্তার

আমি কিছুই করিনা আমার বাচ্চার জন্য, আমার কোন সংসার নেই..
কারন আমি একজন কর্মজীবী নারী..
যে নারী চাকরী করে, সমাজের কাছে নাতো সে ভালো স্ত্রী না ভালো মা.. না আছে তার কোন সংসার, না আছে বাচ্চার প্রতি তার কোন অবদান…!

আমার বাচ্চার বয়স যখন দুই মাস, তখনই আমার ছুটি শেষ.. প্রাইভেট যব, চার মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি.. তার মধ্যে কিছু মেডিক্যাল কন্ডিশনের কারনে দু’মাস আগেই ছুটিতে যেতে হয়েছিলো..
যে চাকুরীজীবী নারী প্রথমবার মা হয়েছে সে জানে, দু’মাসের বাচ্চাকে রেখে নয় দশ ঘন্টা অফিস করতে কেমন লাগে.. অনেকে বলেছে, তুই কেমনে পারিস, কেমন মা? চাকরী ছেড়ে দে, টাকা এত কি জরুরী..?
মা শুধু বলতো, চাকরী ছাড়বিনা, আর আমার হাজবেন্ডও এ ব্যাপারে আমাকে সাপোর্ট করতো খুউব..
আমাদের বাসা থেকে মেইন রোডে উঠতে বেশ অনেকটা পথ হাটতে হয়.. পুরো রাস্তাটা আমি কাঁদতে কাঁদতে অফিস যেতাম.. তিন বছর পর্যন্ত একই ভাবে কাঁদতাম.. অফিসে বসে কিছুক্ষন পরপর সবার সামনে ফ্যালফ্যাল করে কেঁদে ফেলতাম..
যেহেতু আমার বাচ্চাকে আমি বুকের দুধ খাইয়েছি, সেহেতু আমাকে চারমাস দুঘন্টা পরপর বাসায় আসতে হয়েছে, আবার অফিস গিয়েছি.. কি রোদ, কি বৃস্টি.. আমি দেখিনি কিছুই..
কিন্তু আমার বাচ্চার জন্য তেমন কোন অবদান নেই আমার..

আমার বাচ্চা সেই ছোট্ট বেলা থেকে রাতে কম ঘুমায়.. প্রথম দুবছর সে প্রায় ঘুমাতোইনা.. একটু পরপর জেগে উঠতো.. আমাকে প্রায় সারা রাত জাগতে হতো.. আবার সকালে ঐভাবেই অফিস.. এখনো সে রাত একটা, দেড়টা কখনো দুটোর আগে ঘুমায়না..
কিন্তু আসলে আমার বাচ্চার জন্য তেমন কোন অবদান নেই আমার..
সারাদিন অফিসে থাকতাম, সেই কচি কচি হাত দুটো ছুতে পারতামনা বলেই হয়তো, ছোট বেলা থেকে বুকে নিয়ে ঘুম পাড়াতাম, তাই কোলে ঘুমানোর অভ্যাস হয়ে গেলো.. এইতো, দেড় বছর আগেও দুঘন্টা আড়াই ঘন্টা ধরে কোলে নিয়ে ঝাকাতে ঝাকাতে সে ঘুমাতো.. সাড়ে চার বছরের বাচ্চাকে ঘন্টা ধরে কোলে নিয়ে ঝাকিয়ে ঘুম পাড়াতে গিয়ে আমি আর মেরুদন্ড সোজা করতে পারতাম না, দু পায়ে ঝি ঝি ধরে যেত.. আমার হাজবেন্ড ঘুম ভেঙ্গে দেখতো আমি মেয়ে কোলে নিয়ে ও ও বোলে ছড়া কাটছি, আর পা ঝাকাচ্ছি.. বেশির ভাগ সময় দেখে সে আবার পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে যেতো.. দু একদিন হয়তো মায়া হতো, সেদিন আমার পিঠে দুবার হাত বুলিয়ে আবার পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়তো..
তবুও আমি মনে করি আমার বাচ্চার জন্য তেমন কোন অবদান নেই আমার..
আমার যারা কাছের মানুষ, তারা আমার খাওয়া সম্পর্কে জানে… দেড় ঘন্টা, কখনো দুঘন্টা.. এর নিচে তার পুরো প্লেট শেষ হয়না কোনদিন.. আমি কোনদিন ধৈর্য্যহারা হয়ে তাকে অর্ধেক খাইয়ে উঠে যাইনি কোনদিন.. এখনতো আমি বসলে সহযে উঠতে পারিনা, নীলদাড়া সোজা করতে কষ্ট হয়.. অফিস থেকে ফিরে গোসল করে, মেয়ে নিয়ে ব্যস্ত..
তবুও কিছুই করা হয়না আমার..
আমার মেয়ের প্রচুর এলার্জির সমস্যা.. দুদিন পরপর একটা করে অসুখ, অসুখ হলেই আমার আর রক্ষে নেই.. সারা রাত অসুখ যে হারে বাড়ে, আমার যন্ত্রণাও সে হারে বারে.. তিন চার বছর বয়স পর্যন্ত আমার মেয়ের অসুখ বিসুখ হলে, তাকে রাতে কোল থেকে নামাতে পারতাম না.. বাথরুমেও যেতে দিতোনা.. এখনও তার এলার্জির কারনে গা চুলকায়.. রাতভর এখানে চুলকাও, ওখানে ক্রীম লাগাও, পানি খাওয়াও, আবার বাথরুমে যাও.. এই করে করে আমার ছেড়া ছেড়া ঘুমে রোজ মাথা ধরাই থাকে..

ভোরবেলা স্কুলে রেডি করে নিয়ে গিয়ে বসে থাকি, একদিনও নাস্তা খাওয়া হয়না আমার বাড়ির.. সাড়ে নটায় অফিস চলে যাই.. এর মধ্যেও পরীক্ষার পুরো সময়টা বসে থাকি ছুটি নিয়ে, সাংস্কতিক অনুষ্ঠান, এই ডে সেই ডে, সব এ্যাটেন্ড করি..
কিন্তু আমার বাচ্চাটার জন্য তেমন কিছুই করা হয়না আমার…

বাচ্চার স্কুলের আর সব ভাবিরা দুপুরে কি রান্না করবে সেই টেনশনে মরে যায়, কতক্ষনে সব কাজ সেরে বিকেলে ঘুমাবে সেই আনন্দ.. তারা আমাকে ঈর্ষা করে বলে ‘ইশ ভাবি, আপনার কোন ঝামেলা নেই, রান্নাতো করতে হয়না… আমি মুচকি হাসি, তাইতো, অফিসের কাজে ঝামেলা থাকে নাকি কোন? সে তো এম্নিতেই সমাধান হয়ে যায়..! অথচ কতদিন আমি দিনে ঘুমাইনা, কত অসুখে, মাথা ব্যাথা, জ্বর নিয়ে চাইলেই সব ফেলে এক ঘন্টা কাৎ হতে পারিনি.. আজ ভাল্লাগছেনা বলে সব কাজ ছুঁড়ে দিয়ে বিছানায় গা এলাতে পারিনি .. কতদিন দুপুরের বৃষ্টিতে ভিজিনা.. কত দাওয়াত মিস হয়ে যায়.. কত আত্মীয় স্বজন নাম কেটে দিয়েছে আসা যাওয়া নেই বলে.. কতশত বিকেল বারান্দায় আসেনা আমার, কতদিন সূর্যাস্ত দেখা হয়না..

এগুলো কিছুই কাউন্ট হয়না চাকুরীজীবী নারীর..

সপ্তাহে ছয় দিনের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে আট নয় ঘন্টা মেয়ে আমার মা অথবা বোনের কাছে থেকেছে, বাকি পনেরো ঘন্টার দায়িত্ব আমি পালন করেছি..
তাই কিছুই করা হয়নি আমার..ঐ নয় ঘন্টায় আমার সব করা, না করার সমান হয়ে গেছে..

কারন আমি চাকরী করি.. আমি যতই ছুটির দিন চেষ্টা করি আমার হাজবেন্ডের পছন্দের কোন খাবার, বাচ্চার পছন্দের কোন খাবার করে খাওয়াতে, কাপরগুলো ময়লা কিনা, ধুয়ে দিতে, ঘর গোছাতে, বাথরুম পরিস্কার করতে..
বাকি ছদিন ঐ একদিনের সব চেষ্টাকে ব্যর্থ ঘোষনা করে..

নারী মানেইতো দিনশেষে কিছুই করেনা.. হোক সে চাকুরীজীবী অথবা গৃহিণী…
সমাজ গৃহিণীদের স্বীকৃতি দেয়না, আর গৃহিণীরা কর্মজীবী নারীদের..
দিনশেষে সবাইকেই সেই একই ডায়লগ শুনতে হয়.. “করোটা কি তুমি??”